ঠিক না থাকাটাও ঠিক আছে: বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা
বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং মানসিক অবসাদ কোনো দুর্বলতা নয় — এগুলি চিকিৎসাযোগ্য অসুস্থতা। তবুও বেশিরভাগ বাংলাদেশি নীরবে ভোগেন। আসুন, এই আলোচনাটা পরিবর্তন করি।
বাংলাদেশে যখন কারো ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, তখন পরিবার একত্রিত হয়। তারা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে, রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়, ওষুধের দিকে নজর রাখে। কিন্তু যখন কেউ বলে 'আমার মনে হয় আমি বিষণ্ণ', তখন পরিবার বলে 'কেন? তোমার তো বাড়ি আছে, খাবার আছে, চাকরি আছে — বিষণ্ণ হওয়ার কী আছে?'
ঠিক এই কারণেই মানসিক স্বাস্থ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত স্বাস্থ্য সংকট।
পরিসংখ্যান
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশের প্রায় ১৭% প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠী — যা প্রায় ২ কোটি মানুষ — কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ সবচেয়ে সাধারণ। ১৮-২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই সংখ্যা আরও বেশি।
১৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য দেশে ৩০০ জনেরও কম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন। অর্থাৎ, প্রায় ৬ লক্ষ মানুষের জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। গ্রামীণ অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অনুপস্থিত।
যখন বুঝবেন কিছু ঠিক নেই
প্রতিটি খারাপ দিনই বিষণ্ণতা নয়। প্রতিটি দুশ্চিন্তাই উদ্বেগজনিত ব্যাধি নয়। কিন্তু যখন এই বিষয়গুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন বুঝতে হবে কিছু একটা গুরুতর ঘটছে:
- আপনি দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ দিন দুঃখিত, শূন্য বা আশাহীন বোধ করেন
- আপনি যে কাজগুলো আগে উপভোগ করতেন, সেগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন
- আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে — হয় খুব বেশি ঘুমোচ্ছেন বা খুব কম
- আপনি হয় খুব বেশি খাচ্ছেন অথবা কিছুই খাচ্ছেন না
- মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছে — এমনকি এই লেখাটি পড়তেও কষ্ট হতে পারে
- আপনি নিজেকে মূল্যহীন বা অতিরিক্ত অপরাধী মনে করেন
- আপনি নিজের ক্ষতি করার কথা ভেবেছেন
যদি শেষোক্ত বিষয়টি আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়: অনুগ্রহ করে কান পেতে রই (Kaan Pete Roi) হেল্পলাইনে 01779-554391 নম্বরে ফোন করুন। এটি বিনামূল্যে, গোপনীয় এবং কেউ আপনার কথা শুনবে।
'শুধু ইতিবাচক থাকুন' কেন কাজ করে না
বিষণ্ণতায় ভোগা কাউকে 'ইতিবাচক চিন্তা করতে' বলাটা অনেকটা ভাঙা পা নিয়ে কাউকে 'শুধু হাঁটতে' বলার মতো। বিষণ্ণতা মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার সাথে জড়িত একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। এটি চরিত্রের ত্রুটি নয়। এটি দুর্বল বিশ্বাস নয়। এটি এমন কিছু নয় যা আপনি চাইলেই কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
আপনি কি একজন ডায়াবেটিস রোগীকে বলবেন যে শুধু চিন্তা করে তার ইনসুলিন তৈরি করতে? তাহলে বিষণ্ণতায় ভোগা মানুষদের কেন বলি যে তাদের অবস্থা কাল্পনিক?
আসলে কী সাহায্য করে
থেরাপি। একজন প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাথে কথা বলা হালকা থেকে মাঝারি বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের জন্য প্রথম সারির চিকিৎসা। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) বিশেষভাবে কার্যকর এবং সাধারণত ৮-১৬টি সেশনের প্রয়োজন হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের অনেক থেরাপিস্ট এখন অনলাইন সেশন অফার করেন, যা মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিকে যেতে দেখা যাওয়ার সামাজিক কলঙ্ক দূর করে।
ঔষধ। মাঝারি থেকে গুরুতর ক্ষেত্রে, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (যেমন সার্ট্রালিন বা এসসিটালোপ্রাম-এর মতো SSRI) কাজ করে। এগুলি 'সুখের বড়ি' নয় — এগুলি রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা ঠিক করে। এগুলি কাজ শুরু করতে ২-৪ সপ্তাহ সময় নেয়। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা) সাধারণত প্রথম সপ্তাহে ঠিক হয়ে যায়। এবং না, এগুলি আসক্তি তৈরি করে না।
ব্যায়াম। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ হালকা বিষণ্ণতার জন্য হালকা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের মতোই কার্যকর। এমনকি ২০-৩০ মিনিট হাঁটাও এন্ডোরফিন নিঃসরণ করে। এটি নিরাময় নয়, তবে এটি একটি শক্তিশালী সহায়ক।
ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি। একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে কোনো স্ক্রিন নয় (জানি, কঠিন — ৩০ মিনিট চেষ্টা করুন)। অন্ধকার ঘর, ঠাণ্ডা তাপমাত্রা। ঘুমের অভাব এবং বিষণ্ণতা একটি দুষ্টচক্রের মতো একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগ। বিচ্ছিন্নতা সবকিছুকে আরও খারাপ করে তোলে। এমনকি যখন কারো সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করে না — বিশেষ করে যখন ইচ্ছা করে না — তখনো দিনে অন্তত একটি মানুষের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন। একজন বন্ধুকে ফোন করুন। রাতের খাবারে পরিবারের সাথে বসুন। এটা গুরুত্বপূর্ণ।
যে কষ্ট পাচ্ছে তাকে কী বলবেন
বলবেন না: 'তোমার দুঃখ করার কী আছে?' অথবা 'বেশি করে প্রার্থনা করো।'
বলুন: 'আমি আছি। তুমি কি এটা নিয়ে কথা বলতে চাও? আর যদি না চাও, সেটাও ঠিক আছে।'
মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি কোনো পশ্চিমা ধারণা নয় যা আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিষণ্ণতা আপনার আয়, ধর্ম বা পোস্টাল কোড দেখে আসে না। এটি যে কাউকে, যেকোনো জায়গায় আঘাত করতে পারে।
সবচেয়ে সাহসী কাজ হলো সাহায্য চাওয়া। দ্বিতীয় সাহসী কাজ হলো অন্য কাউকে একই কাজ করতে সাহায্য করা।