বাংলাদেশে ডেঙ্গু: বর্ষা আসার আগে প্রতিটি পরিবারের যা জানা দরকার
বাংলাদেশে প্রতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে শত শত মানুষ মারা যায়। লক্ষণ, সতর্কীকরণ চিহ্ন এবং কখন হাসপাতালে যেতে হবে সে সম্পর্কে এটি একটি সহজবোধ্য নির্দেশিকা।
প্রতি বছর, জুন মাস এলেই বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে একই আলোচনা শুরু হয়: 'ডেঙ্গুর মৌসুম আসছে।' আর প্রতি বছর, এটি আসছে জেনেও পরিবারগুলো অপ্রস্তুত থাকে।
আমি মিষ্টি কথা বলব না — ডেঙ্গু বিপজ্জনক। শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই বাংলাদেশে ৩ লক্ষেরও বেশি ডেঙ্গু রোগী এবং ১,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। এরা কারো বাবা, কারো সন্তান।
তাহলে চলুন, আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলি।
মশা
ডেঙ্গু এডিস ইজিপ্টি মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশা দিনের বেলায় কামড়ায়, বিশেষ করে সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার আগে। তারা স্থির পানিতে বংশবৃদ্ধি করে — ফুলের টব, পুরনো টায়ার, এসি ড্রিপ ট্রে, নির্মাণাধীন স্থান, এমনকি আপনার ছাদের পানির ট্যাঙ্ক যদি ঢাকা না থাকে সেখানেও। আপনার বারান্দায় সেই অর্ধেক ভরা বালতিটি মনে আছে? সেটি একটি মশার প্রজনন ক্ষেত্র।
যে লক্ষণগুলো খেয়াল রাখবেন
তীব্র জ্বর (সাধারণত ১০৪°ফা / ৪০°সে), তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, জয়েন্ট এবং মাংসপেশীতে ব্যথা (এজন্যই একে 'হাড়ভাঙা জ্বর' বলা হয়), বমি বমি ভাব এবং জ্বরের ২-৫ দিন পর ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া। বেশিরভাগ মানুষ বিশ্রাম এবং পর্যাপ্ত তরল পান করে এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
কিন্তু এখানেই বিষয়টি গুরুতর হয়ে ওঠে।
সতর্কীকরণ চিহ্ন — অবিলম্বে হাসপাতালে যান যদি:
- তীব্র পেটে ব্যথা
- একটানা বমি (দিনে ৩ বারের বেশি)
- মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত
- মল বা বমিতে রক্ত
- দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা অস্থিরতা অনুভব করা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা বিরক্তি
- প্লেটলেট সংখ্যা ১,০০,০০০ এর নিচে নেমে যাওয়া
এগুলো ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের ইঙ্গিত হতে পারে এবং চিকিৎসায় দেরি করলে তা মারাত্মক হতে পারে।
বাড়িতে কী করবেন
যদি এটি হালকা ডেঙ্গু হয়: বিশ্রাম নিন, প্রচুর তরল পান করুন (ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, ফলের রস), জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল গ্রহণ করুন এবং প্রতিদিন একটি সিবিসি (CBC) পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার প্লেটলেট সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করুন। এটুকুই। অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন নয় — এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্লেটলেট সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না। আমি দেখেছি পরিবারগুলো আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতালে ছুটে যায় কারণ প্লেটলেট ৮০,০০০ এ নেমে গেছে। এটি উদ্বেগের, হ্যাঁ, তবে শুধুমাত্র প্লেটলেট সংখ্যাই পুরো চিত্র তুলে ধরে না। রোগীর রক্তপাত হচ্ছে কিনা, তিনি পানিশূন্য কিনা এবং সামগ্রিকভাবে তিনি কেমন অনুভব করছেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরোধ
মশা তাড়ানোর স্প্রে ব্যবহার করুন (দিনের বেলায়ও)। সম্ভব হলে মশারির নিচে ঘুমান। সকালে এবং সন্ধ্যায় লম্বা হাতাযুক্ত পোশাক পরুন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আপনার বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলুন। আপনার পুরো প্রতিবেশীকে এতে জড়িত করুন — একটি অসতর্ক বাড়ি পুরো এলাকার জন্য মশা তৈরি করতে পারে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশনগুলো মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালায়, কিন্তু সত্যি বলতে — তারা সবকিছু কভার করতে পারে না। প্রতিরোধ শুরু হয় বাড়ি থেকেই।
বর্ষাকালে যদি আপনার বা আপনার সন্তানের হঠাৎ তীব্র জ্বর হয়, তবে প্রথম ৩ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করিয়ে নিন। এটি সস্তা, দ্রুত এবং আপনাকে একটি স্পষ্ট উত্তর দেবে। অপেক্ষা করবেন না এবং 'শুধু ফ্লু' ভেবে আশা করবেন না।